আলোময়.কম হোম,ইসলাম ও বিজ্ঞান, ফিডব্যাক,অংশ নিন fb page

বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ, ২০১৩

আবু জাহেলের সন্তানের ইসলাম গ্রহণ ও নতুন জীবনের ঘটনা

 মূলঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথা -১
ড মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ
ইকরিমা ইবন আবী জাহল রাদিয়াল্লাহু আনহু, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্পর্কে বলেনঃ “শিগগিরই ইকরিমা কুফর ত্যাগ করে মু’মিন হিসেবে তোমাদের কাছে আসছে। তোমরা তাঁর পিতাকে (আবু জাহল) গালি দেবেনা। কারণ মৃতকে গালি দিলে জীবিতদের মনোকষ্টের কারণ হয় এবং মৃতের কাছে তা পৌঁছেনা”।

নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কায় দ্বীনের দাওয়াত দিতে শুরু করেন তখন ইকরিমার বয়সের তৃতীয় দশকটি শেষ হতে চলেছে। কুরাইশদের মধ্যে বংশের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন সর্বাধিক সম্মানিত ও ধনশালী। মক্কায় সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, মুস’য়াব ইবন উমাইর প্রমুখের মত তাঁরও উচিত ছিল প্রথম স্তরেই ইসলাম গ্রহণ করা। কিন্তু তাঁর পিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।

তাঁর পিতা আবু জাহল ছিল সবচেয়ে বড় স্বেচ্ছাচারী, প্রথম মুশরিকদের নেতা ও কঠোর অত্যাচারী। আল্লাহ তা’আলা তার অত্যাচার-উৎপীড়নের মাধ্যমে মু’মিনদের ঈমান পরীক্ষা করেছেন এবং সে পরীক্ষায় তাঁরা সফলকাম হয়েছেন। তার ধোঁকার মাধ্যমে বিশ্বাসীদের সত্যতা যাচাই করেছেন এবং তাতে তাঁরা উত্তীর্ণ হয়েছেন।

প্রাথমিক জীবনে ইসলামের প্রতি শত্রুতাঃ

পিতার নেতৃত্বে ইকরিমা মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শত্রুতায় আত্মনিয়োগ করেন। এ ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কঠোর। তাঁর অত্যাচারে রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে পড়েছিল। ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি তাঁর এ নিষ্ঠুরতা দেখে তাঁর পিতা আবু জাহল পরম আত্মতৃপ্তি অনুভব করতো।

তাঁর পিতা বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের নেতৃত্ব দেয়। সে লাত ও উজ্জার নামে শপথ করে যে, মুহাম্মাদের একটা হেনস্তা না করে মক্কায় ফিরবে না। বদরে ঘাঁটি গেড়ে তিন দিন আবস্থান করলো, উট জবেহ করলো, মদ পান করে মাতাল হলো এবং গায়ক-গায়িকাদের নিয়ে নাচ-গানে মত্ত হলো। আবু জাহল যখন এ যুদ্ধ পরিচালনা করছিল, ইকরিমা তখন তার ডান হাত-প্রধান সহযোগী। কিন্তু লাত ও উজ্জা এ যুদ্ধে আবু জাহলের ডাকে সাড়া দেয়নি, এ দু’টি উপাস্য মূর্তি তাকে কোন সাহায্য করতে পারেনি, সম্ভবও ছিলো না।

বদরের ময়দানে আবু জাহল মুখ থুবড়ে পড়ে রইলো। ইকরিমা নিজ চোখেই দেখলেন কিভাবে মুসলমানদের তীরের ফলা তাঁর পিতার রক্ত পান করছে এবং তিনি নিজ কানেই শুনতে পেলেন তাঁর পিতার মুখের অন্তিম চিৎকার ধ্বনিটি।

কুরাইশ নেতা আবু জাহলের মৃতদেহটি বদরে ফেলে রেখে ইকরিমা মক্কায় ফিরে এলেন। শোচনীয় পরাজয় তাকে পিতার লাশটি দাফনের সুযোগ পর্যন্ত দেয়নি। মুসলমানরা বদরের নিহত অন্যান্য মুশরিক সৈন্যদের সাথে তারও লাশটি ’কালীব’ নামক কূপে নিক্ষেপ করে মাটি চাপা দেয়। এভাবেই এ অহঙ্কারী অত্যাচারী কুরাইশ নেতার দর্প চূর্ণ হয়।

এ দিন থেকেই ইসলামের সাথে ইকরিমার আচরণ নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করে। এ যাবত তিনি পিতার মান-মর্যাদা রক্ষার্থে ইসলামের সাথে দুশমনী করে এসেছেন। আর এখন তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন পিতার রক্তের প্রতিশোধ প্রহণের। বদরে অন্য যারা পিতৃহারা হয়েছিল, তিনি তাদের সাথে সম্মিলিতভাবে মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরুদ্ধে মুশরিকদের অন্তরে শত্রুতার আগুন জ্বালিয়ে দিতে শুরু করলেন এবং তাদেরকে বদরে নিহতদের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করতে লাগলেন। এভাবেই উহুদের যুদ্ধটি সংগঠিত হয়।

ইকরিমা ইবন আবু জাহল উহুদের দিকে যাত্রা করলেন। সংগে তাঁর স্ত্রী উম্মু হাকীমও বদরে স্বামী, ভ্রাতা ও পুত্রহারা নারীদের সাথে চললেন। উদ্দেশ্য, তারা সেখানে যুদ্ধরত সৈনিকদের পশ্চাতে অবস্থান করে বাদ্য বাজাবেন, কুরাইশদেরকে যুদ্ধে উৎসাহ দেবেন এবং পলায়ন উদ্যত সৈনিকদেরকে সাহস ও শক্তি যোগাবেন।

কুরাইশরা তাদের অশ্বারোহী সৈনিকদের ডান দিকে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও বাম দিকে ইকরিমা ইবন আবী জাহেলকে নিয়োগ করলো। সেদিন তারা দু’জন সাহসিকতা ও রণকৌশলের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন। তাই সেদিনকার কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান বলতে পেরেছিলেনঃ ‘এটা বদরের দিনের প্রতিশোধ।’

এরপর এলো খন্দকের যুদ্ধ। মুশরিক সৈন্যরা কয়েকদিন যাবত মদীনা আবরোধ করে রেখেছে। ইকরিমার ধৈর্যের বাঁধ ভেংগে যাচ্ছে, তিনি তিক্ত-বিরক্ত হয়ে উঠছেন। অবশেষে তিনি দেখতে পেলেন খন্দকের এক স্থানে সংকীর্ণ একটা পথ। তার মধ্য দিয়ে অতি কষ্টে তিনি তাঁর ঘোড়াটি ঢুকিয়ে এবং খন্দক পার হয়ে গেলেন। তাঁকে অনুসরণ করে খন্দক পার হলো আরো মুশরিক সৈনিক। মুসলিম সৈনিকরা তাদেরকে তাড়া করে। ইকরিমা তাঁর অন্য সংগীদের সাথে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচান, কিন্তু তাঁর একজন সংগী আমর ইবনু আবদে উদ্দ আল-আমিরী মুসলিম সৈনিকদের হাতে প্রাণ হারায়।

মক্কা বিজয়, ইকরিমার অবাধ্যতা ও প্রাণভয়ে পলায়নঃ

মক্কা বিজয়ের দিন কুরাইশরা বুঝতে পারল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাথীদের বাধা দেওয়া কোনভাবেই সম্ভব হবে না । তারা মুসলমানদের পথ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করলেনঃ মক্কাবাসীদের যারা মুসলিম সৈনিকদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে, কেবল তাদের সাথেই যুদ্ধ করা হবে। তাছাড়া অন্য সকলকে ক্ষমা করা হবে।

ইকরিমা ইবনে আবী জাহল এবং আরো একদল সৈনিক কুরাইশদের সিদ্ধান্ত অমান্য করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ খাড়া করেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুসলিম সৈনিকদের ছোট্র একটি দল তাদের এ প্রতিরোধ ব্যুহ তছনচ করে দেয়। তাঁরা তাদের অনেককে হত্যা করে এবং অনেকে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচায়। এ পলায়নকারীদের মধ্যে ইকরিমা ইবন আবী জাহলও ছিলেন।

মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের পর ইকরিমা ইবন আবী জাহল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হযে পড়লেন। তিনি এই প্রথম বারের মত তাঁর শক্তি মদমত্ততা থেকে সম্বিত ফিরে পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন মক্কা আর তাঁর জন্য নিরাপদ নয়। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কাবাসীদের সকলের অতীত আচরণ ক্ষমা করে দেন। তবে তিনি কয়েকজনের নাম উচ্চারণ করে তাদেরকে এ ক্ষমার আওতা থেকে ব্যতিক্রম ঘোষণা করেন। কা’বার গিলাফের নীচে পাওয়া গেলেও তিনি তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন। হত্যার নির্দেশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকার শীর্ষস্থানে ইকরিমার নামটি।তিনি কোন উপায়ান্তর না দেখে গোপনে মক্কা থেকে বের হয়ে ইয়ামনের দিকে যাত্রা করেন।

এদিকে ইকরিমার স্ত্রী উম্মু হাকীম ও হিন্দা বিনতু উতবা গেলেন রাসূলূল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে। তাদের সাথে গেলেন আরো অনেক মহিলা।উদ্দেশ্য তাদের, রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতে বাইয়াত হওয়া। তাঁরা যখন রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে পৌঁছলেন, তখন তাঁর কাছে বসা ছিলেন তাঁর দু’স্ত্রী, কন্যা ফাতিমা ও বনী আবদুল মুত্তালিবের বহু মহিলা। মাথা ও মুখ ঢাকা অবস্থায় হিন্দা কথা বললেন রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে। হিন্দা ছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী ও আমীর মুয়াবিয়ার মা। উহুদের যুদ্ধে হযরত হামযার রাদিয়াল্লাহু আনহু কলিজা চিবিয়েছিলেন ইনিই। তাই মক্কা বিজযের দিনে লজ্জা ও অনুশোচনার মাথা ও মুখ ঢেকে তিনি রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দরবারে উপস্থিত হন।

‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি তাঁর মনোনীত দ্বীনকে বিজয়ী করেছেন। আপনার ও আমার মাঝে যে আত্মীয়তার সম্পর্কে রয়েছে সে সূত্রে আমি আপনার নিকট ভালো ব্যবহার আশা করি। এখন আমি একজন ঈমানদার ও বিশ্বাসী নারী’ এ কথা বলেই তিনি তাঁর অবগুন্ঠন খুলে পরিচয় দেন ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি হিন্দা বিনতু উতবা,। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ’খোশ আমদেদ, বললেন, ’ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহর কসম, হেয় ও অপমানিত করার জন্য আপনার বাড়ী থেকে আমার নিকট অধিক প্রিয় বাড়ী ধরাপৃষ্ঠে এর আগে ছিলনা। আর এখন আপনার বাড়ী থেকে অধিক সম্মনিত বাড়ী আমার নিকট দ্বিতীয়টি নেই।’ রাসূল (সা) বললেনঃ আরো অনেক বেশী।

এরপর ইকরিমার স্ত্রী উম্মু হাকীম উঠে দাঁড়িয়ে ইসলাম গ্রহণের স্কীকৃতি দিলেন। তারপর বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি ইকরিমাকে হত্যা করতে পারেন, এ ভয়ে সে ইয়ামনের দিকে পালিয়ে গেছে। আপনি তাকে নিরাপত্তা দিন আল্লাহ আপনাকে দেবেন।’ রাসূল (সা) বললেন, ’সে নিরাপদ’।

পলাতক ইকরিমার খোঁজে তার স্ত্রীর অনুসন্ধানঃ

সেই মুহূর্তে উম্মু হাকীম তাঁর স্বামী ইকরিমার সন্ধানে বের হলেন। সংগে নিলেন তাঁর এক রূমী ক্রীতদাস। তারা দু’জন রাস্তায় চলছেন। পথিমধ্যে দাসটির মনে তার মনিবের প্রতি অসৎ কামনা দেখা দিল। সে চাইলো তাঁকে ভোগ করতে, আর তিনি নানা রকম টালবাহানা করে সময় কাটাতে লাগলেন। এভাবে তারা একটি আরব গোত্রে পৌঁছলেন। সেখানে উম্মু হাকীম তাদের সাহায্য কামনা করলেন। তারা তাকে সাহায্যের আশ্বাস দিল। তিনি তাঁর দাসটিকে তাদের জিম্মায় রেখে একাকী পথে বের হলেন। অবশেষে তিনি তিহামা অঞ্চলে সমুদ্র উপকূলে ইকরিমার দেখা পেলেন। সেখানে তিনি এক মাঝির সাথে কথা বলছেন তাঁকে পার করে দেওয়ার জন্য, আর মাঝি তাঁকে বলছেনঃ ‘সত্যবাদী হও’

ইকরিমা তাকে বললেন, ‘কিভাবে আমি সত্যবাদী হবো?’

মাঝি বললেন, ‘তুমি বলো, আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।’

-‘আমি তো শুধু এ কারণেই পালিয়েছি।’ তাদের দু’জনের এ কথোপকথনের মাঝখানেই উম্মু হাকীম উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁর স্বামীকে লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘হে আমার চাচাতো ভাই, আমি সর্বোত্তম, সর্বশ্রেষ্ঠ ও পবিত্রতম ব্যক্তির নিকট থেকে আসছি। আমি তাঁর কাছে তোমার জন্য আমান চেয়েছি। তিনি তোমার আমান মঞ্জুর করেছেন। সুতরাং এরপরও তুমি নিজেকে ধ্বংস করোনা।’

এ কথা শুনে ইকরিমা জিজ্ঞেস করলেনঃ -‘তুমি নিজেই তাঁর সাথে কথা বলেছো?’

তিনি বললেনঃ ‘হা, আমিই তাঁর সাথে কথা বলেছি, এবং তিনি তোমাকে আমান দিয়েছেন’- এভাবে বার বার তিনি তাঁকে আমানের কথা শুনাতে লাগলেন ও তাঁকে আশ্বাস দিতে লাগলেন। আবশেষে আশ্বস্ত হয়ে তিনি স্ত্রীর সাথে ফিরে চললেন।

পথে চলতে চলতে উম্মু হাকীম তাঁর দাসটির কান্ড-কারখানার কথা স্বামীকে খুলে বললেন। ফেরার পথে ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই ইকরিমা দাসটিকে হত্যা করেন।

পথিমধ্যে তাঁরা এক বাড়ীতে রাত্রি যাপন করেন। ইকরিমা চাইলেন একান্তে তাঁর স্ত্রী সাথে মিলিত হতে। কিন্তু স্ত্রী কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমি একজন মুসলিম নারী এবং আাপনি এখনও একজন মুশরিক। স্ত্রীর কথা শুনে ইকরিমা অবাক হয়ে গেলেন।

তিনি বললেন, ‘তোমার ও আমার মিলনের মাঝখানে যে ব্যাপারটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে তা তো খুব বিরাট ব্যাপার’।!

ইসলাম গ্রহণঃ

এভাবে ইকরিমা যখন মক্কার নিকটবর্তী হলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীদের বললেনঃ ’খুব শিগগিরই ইকরিমা কুফর ত্যাগ করে মুমিন হিসেবে তোমাদের কাছে আসছে । তোমরা তাঁর পিতাকে গালি দেবে না । কারণ মৃতকে গালি দিলে তা জীবিতদের মনে কষ্টের কারণ হয় এবং মৃতের কাছে তা পৌঁছে না’।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ইকরিমা তাঁর স্ত্রীসহ রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে উপস্থিত হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখেই আনন্দে উঠে দাড়ালেন এবং চাদর গায়ে না জড়িয়েই তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসলেন। ইকরিমা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলেনঃ

-‘ইয়া মুহাম্মদ, উম্মু হাকীম আমাকে বলেছে, আপনি আমাকে আমান দিয়েছেন।’

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘সে সত্যই বলেছে। তুমি নিরাপদ।’

ইকরিমা বললেন, ‘মুহাম্মদ, আপনি কিসের দাওয়াত দিয়ে থাকেন?’

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ’আমি তোমাকে দাওয়াত দিচ্ছি তুমি সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা’বুদ নেই এবং আমি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল। তারপর তুমি নামায কায়েম করবে, যাকাত দান করবে।’ এভাবে তিনি ইসলামের সবগুলি আরকান বর্ণনা করলেন।

ইকরিমা বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আপনি একমাত্র সত্যের দিকেই দাওয়াত দিচ্ছেন এবং কল্যাণের নির্দেশ দিচ্ছেন।’ তারপর বলতে লাগলেনঃ -‘এ দাওয়াতের পূর্বেই আপনি ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী এবং সবচেয়ে সৎকর্র্মশীল।’ তারপর একথা বলতে বলতে তিনি হাত বাড়িয়ে দেন এবং বলেন, ‘আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্নাকা আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।’ একথার পর তিনি বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি বলতে পারি, এমন কিছু ভাল কথা আমাকে শিখিয়ে দিন।’

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তুমি বলো, আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।’

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তুমি বলো, ‘উশহিদুল্লাহা ওয়া উশহিদু মান হাদারা আন্নি মুসলিমুন মুজাহিদুন মুহাজিরুন’-আল্লাহ ও উপস্থিত সকলকে সাক্ষী রেখে আমি বলছি,আমি একজন মুসলিম, মুজাহিদ ও মুহাজির।”

ইকরিমা তা-ই বললেন। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, ‘অন্য কাউকে আমি দিচ্ছি, এমন কোন কিছু আজ যদি আমার কাছে চাও, অমি তোমাকে দেব।’

ইকরিমা বললেন, ‘আমি আপনার কাছে চাচ্ছি, যত শত্রুতা আমি আপনার সাথে করেছি, যত যুদ্ধে আমি আপনার মুখোমুখি হয়েছি এবং আপনার সামনে অথবা পশ্চাতে যত কথাই আমি বিরুদ্ধে বলেছি-সবকিছুর জন্য আপনি আল্লাহর কাছে আমার মাগফিরাত কামনা করুন।’ তক্ষুণি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দু’আ করলেনঃ ‘হে আল্লাহ যত শত্রুতাই সে আমার সাথে করেছে, তোমার নূরকে নিভিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হতে যত পথই সে ভ্রমণ করেছে, সবকিছুই তাঁকে ক্ষমা করে দাও। আমার সামনে বা অগোচরে আমার মানহানিকার যত কথাই সে বলেছে, তা-ও তুমি ক্ষমা করে দাও।’

আনন্দে ইকরিমার মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য যতকিছু আমি ব্যয় করেছি তার দ্বিগুণ আমি আল্লাহুর রাস্তায় ব্যয় করবো এবং আল্লাহর রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যত যুদ্ধ আমি করেছি, তার দ্বিগুণ যুদ্ধ আমি আল্লাহর রাস্তায় করবো।’

এ এক নতুন জীবনঃ

এ দিন থেকেই তিনি দাওয়াতের মিছিলে প্রবেশ করলেন। তিনি হলেন যুদ্ধের ময়দানে দুঃসাহসী আশ্বারোহী সর্বাধিক ইবাদতকারী, রাত্রি জাগরণকারী ও আল্লাহর কিতাব পাঠকারী। পবিত্র কুরআন মুখের ওপর রেখে তিনি বলতেনঃ ‘কিতাবু রাব্বি কালামু রাব্বি -আমার রবের কিতাব, আমার রবের কালাম।’ একথা বলতেন, আর আকুল হয়ে কাঁদতেন।

রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে ইকরিমা যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তিনি অক্ষরে তা পালন করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানরা যত যুদ্ধই করেছে, তার প্রত্যেকটিতে তিনি অংশ নেন এবং যত অভিযানেই তাঁরা বের হয়েছে তিনি থাকেন তার পুরোভাগে।

ইয়ারমুকের যুদ্ধে গ্রীম্মের দুপুরে পিপাসিত ব্যক্তি যেমন ঠান্ডা পানির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তেমনি তিনি শত্রুপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধের কোন এক পর্যায়ে মুসলমানদের ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি হলো, তিনি তখন ঘোড়া থেকে নেমে তরবারি কোষ-মুক্ত করেন এবং রোমান বাহিনীর অভ্যন্তরভাগে ঢুকে পড়েন। অবস্থা বেগতিক দেখে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তাঁর দিকে ছুটে যান এবং বলেন, ‘ইকরিমা এমনটি করোনা। তোমার হত্যা মুসলমানদের জন্য বিপজ্জনক হবে।’

জবাবে তিনি বললেনঃ

‘খালিদ আমাকে ছেড়ে দাও। রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওপর ঈমান আনার ব্যাপারে তুমি আমার থেকে অগ্রগামী। আমার পিতা ও আমি ছিলাম রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে বড় শত্রু। আমাকে আমার অতীতের কাফফারা আদায় করতে দাও। অনেক যুদ্ধেই আমি রাসূলূল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরুদ্ধে লড়েছি। আর আজ আমি রোমান বাহিনীর ভয়ে পালিয়ে যাব? এ আমার পক্ষে সম্বব নয়।’ একথা বলে তিনি মুসলমানদের কাছে আবেদন জানলেন, ‘মৃত্যুর ওপর বাইয়াত করতে চায় কে?’ তাঁর এ আহ্বানে সাড়া দিলেন তাঁর চাচা হারিস ইবন হিশাম, দিরার ইবনুল আযওয়ার ও আরো চার‘শ মুসলিম সৈনিক। তাঁরা খালিদ ইবন ওয়ালিদের তাবুর সম্মুখভাগ থেকেই তুমুল লড়াই চালিয়ে ইয়ারমুকের ময়দানে বিরাট বিজয় ও সম্মান বয়ে এনেছিলেন। এই ইয়ারমুকের ময়দানেই হারিস ইবন হিশাম, আয়য়াশ ইবন আবী রাবিয়া ও ইকরিমা ইবন আবী জাহলকে ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেল। পিপাসায় কাতর হারিস ইবনে হিশাম পানি চাইলেন। যখন তাকে পানি দেয়া হলো, ইকরিমা তখন তাঁর দিকে তাকালেন। এ দেখে তিনি বললেন, ’ইকরিমাকে দাও’। পানির গ্লাসটি যখন ইকরিমার কাছে নিয়ে যাওয়া হলো তখন আয়য়াশ তাঁর দিকে তাকালেন। তা দেখে ইকরিমা বললেন, ‘আয়য়াশকে দাও’। আয়য়াশের কাছে পানির গ্লাসটি নিয়ে যাওয়া হলে দেখা গেল, তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তারপর গ্লাসটি হাতে নিয়ে একে একে তাঁর অপর দুই সাথীর কাছে গিয়ে দেখা গেল তাঁরাও তাঁরই পথের পথিক হয়েছেন, আল্লাহ তা’আলা তাঁদের সকলের প্রতি রাজী ও খুশী থাকুন। আমীন।

ইমেইলে গ্রাহক হোন